
গাজাবাসীদের ওপর আরও নির্মম ইসরাইলি হামলা চলছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৭৮৭ জনে। নতুন উপায়ে চলছে অত্যাচার। এবার গাজায় ব্যক্তিগত বাড়িঘরে তাণ্ডব চালাচ্ছে ইসরাইলের সেনাবাহিনী। এমনকি খেলনাসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দোকানে ঢুকেও ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে তারা। ইসরাইলি সেনারা শুধু লুট করেই ক্ষান্ত থাকেনি। খাবার ও পানি সরবরাহে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে জানিয়েছে এপি।
এছাড়া সম্প্রতি গাজায় ইসরাইলি সেনাদের অবমাননাকর আচরণের বেশ কয়েকটি ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। ভিডিওতে ইসরাইলি সেনাদের অস্ত্র নিয়ে উল্লাস করতে দেখা গেছে। এ সময় তারা বিভিন্ন বর্ণবাদী স্লোগানও দিচ্ছিল। বেসামরিক মানুষের মৃত্যু সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসরাইলি সেনাদের এমন আচরণ আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ইতোমধ্যেই অনেক দেশের সমর্থনও হারিয়েছে ইসরাইল। গাজায় বর্বর হত্যাযজ্ঞের অন্ধ সমর্থন দিয়ে নিজ দেশেই বিপাকে পড়ল বাইডেন প্রশাসনও। আলজাজিরার বুধবারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজায় যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের (ডিএইচএস) কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন বিভাগের শতাধিক কর্মকর্তা। তারা বিভাগের মন্ত্রী আলেহান্দ্রো মায়রকাসকে গত ২২ নভেম্বর দেওয়া এক খোলাচিঠিতে গাজায় তাদের একচোখা নীতির অভিযোগ তুলে এই নিন্দা জানান। গাজায় প্রায় ১৮ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার ঘটনায় হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের বার্তায় স্বীকৃতি, সমর্থন ও সহমর্মিতার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো অবস্থান না থাকায় খোলাচিঠিতে হতাশাও প্রকাশ করা হয়। তবে বিশ্ব সমর্থন না থাকলেও গাজায় হামলা বন্ধ হবে না বলে মন্তব্য করেছে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। অঞ্চলটিতে ‘বিজয়’ না পাওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে বলে জানিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার এএফপির খবরে বলা হয়েছে, বুধবার এক ভিডিওবার্তায় এমন মন্তব্য করেছেন নেতানিয়াহু। তিনি আরও বলেন, কোনো কিছুই ইসরাইলকে থামাতে পারবে না।
রাফাহ এখন তাঁবুর সাগর : প্রথমে উত্তর গাজা। পরে দক্ষিণ গাজা। এখন আবার উত্তর-দক্ষিণ দুই জায়গাতেই হামলা চালাচ্ছে ইসরাইল। কোথাও নিরাপত্তা নেই। অবশেষে দক্ষিণ গাজারই ইসরাইলের নির্দেশে ‘নিরাপদ স্থানে’ আশ্রয় নিয়েছেন অসহায় ফিলিস্তিনিরা। রাফাহ এখন তাঁবুর সাগর। কাঠ ও প্লাস্টিকের চাদরের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে ছেয়ে গেছে পুরো অঞ্চল। একই তাঁবুর নিচে থাকছেন ধনী-গরিব সবাই। কিন্তু ধনী-দরিদ্র সবারই সেখানে একই দশা। গাজায় এখন গাড়ি-বাড়ি, টাকাকড়ি-ধনদৌলত সবই অর্থহীন। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় মৌলিক সরবরাহের অভাবে ভুগছেন প্রত্যেকেই। ফিলিস্তিনি শিক্ষিকা সমর মোহাম্মদ (৩৮)। গাজা সিটিতে ২০০ বর্গমিটার অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে তিনি তার স্বামী ও সন্তানসহ রাফাহতে একটি বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। সমর বলেন, ‘জ্বালানির অভাবে আমার গাড়ি এক মাসেরও বেশি সময় ধরে রাস্তায় পার্ক করা আছে। আমাদের টাকা আছে সেজন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ কিন্তু বাজার খালি।’ তিনি আরও বলেন, ‘টাকা এখন কোনো মূল্য ছাড়াই শুধু কাগজে পরিণত হয়েছে। আপনার কাছে এক মিলিয়ন শেকেল থাকলেও আপনি আপনার পরিবারকে রক্ষা করতে পারবেন না। তাঁবুতে ধনী ও দরিদ্ররা পাশাপাশি থাকছে। তারা একই খাবার খায়, একই পানীয় পান করে। কারও কোনো নিরাপত্তা নেই।’ দক্ষিণ গাজা থেকে পালিয়ে রাফাহ এসেছেন আরেক ফিলিস্তিনি মোহাম্মদ আল-মাহদুন (৩৬)। প্রতিমাসে ১ হাজার ইউএস ডলার খরচ করার মতো সামর্থ্য আছে তার। কিন্তু গাজায় কিছুই পাওয়া যায় না। আল-মাহদুন বলেন, ‘আমরা খুব ভালো মানের কিছু খুঁজছি না। কিন্তু টাকা-পয়সা এখন অর্থহীন হয়ে গেছে।’ পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় তার গাড়িটিও রেখে আসতে হয়েছিল বলে জানান তিনি।
আল-মাহদুন আরও বলেন, ‘আমার ছেলে যখন আমার কাছে কিছু চায় তখন আমি অসহায়বোধ করি। সে চকোলেট এবং ক্রিস্পস চায়। আর সেগুলো কিনে দেওয়ার সামর্থ্যও আমার আছে। কিন্তু এখানে এসব পাওয়া যায় না।’
একটি নতুন আর উজ্জ্বল রঙের জিপের মালিক আবু খালেদ (৪৭)। তিনি বলেন, আমি আমার পরিবারের সঙ্গে গাড়িতে ঘুমাই। আর গাড়িটি একটি হাসপাতালের পাশে পার্ক করেছি, যেন বাথরুমে যাওয়া সহজ হয়। তিক্ততাভরা হাসি নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা একটি পুলসহ একটি ভিলায় থাকতাম। এখন আমরা রাস্তায় আছি।’ প্রয়োজনীয় কিছু মৌলিক সরবরাহের আশায় প্রতিদিনই বিতরণ কেন্দ্রগুলোর আশপাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে ফিলিস্তিনিরা। এদিকে ইসরাইলি হামলা থামারও কোনো লক্ষণ নেই। শীতকালীন বৃষ্টিও শুরু হয়েছে অঞ্চলটিতে। বন্যা ও বৃষ্টির কারণে গাজার পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

Posted ৭:৪৯ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৩
দৈনিক বরিশালের আলো | Roktim Hasan


